দেশি মুরগির বাচ্চা পালন ও চিকিৎসা সম্পর্ক জানলে লাভবান হবেন
দেশি মুরগি সাধারণত আমাদের দেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই দেশি মুরগির বাচ্চা পালন ও চিকিৎসা সম্পর্কে আপনার জানা থাকলে অনেক উপকার হবে। চলুন কিভাবে লালন পালন করলে আপনি উপকার পাবেন এসব বিস্তারিতভাবে জেনে নেওয়া যাক।
বর্তমানে আমাদের দেশি মুরগি পাওয়া খুবই কঠিন হয়ে গিয়েছে। কেননা বাণিজ্যিকভাবে এই দেশি মুরগি লালন-পালন করে লাভবান সম্পর্কে আপনার ধারণা থাকতে হবে, তাই দেশি মুরগির বাচ্চা পালন ও চিকিৎসা সম্পর্কে জানতে আর্টিকেলটি মনোযোগ দিয়ে পড়ুন।
প্রাচীনকাল থেকে গ্রাম অঞ্চলে সাধারণত মহিলারা দেশি মুরগি লালন পালন করে থাকে। তারা প্রাকৃতিক উপায়ে লালন-পালন করার কারণে এই দেশি মুরগিগুলোর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকে। কেননা এই মুরগিগুলো সাধারণত প্রাকৃতিক খাবার খেয়ে থাকে। এর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন থাকে যার কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। কেননা এই ঘাস-পাতা লতাপাতা এর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন থাকে, যার কারণে এর ডিম ও মাংস অনেক সুস্বাদু কিন্তু বিদেশী মুরগী গুলো সাধারণত বাণিজ্যিকভাবে লালন পালন করা হয়, যার কারণে এর পুষ্টিগুণ কম। তবে তবে দেশী মুরগীর চাহিদা অনেক রয়েছে।
দেশি মুরগি সাধারণত অন্যান্য জাতের মুরগির চাইতে খাবার কম খেয়ে থাকে, কম জায়গার মধ্যে লালন পালন করা যায়। উৎপাদন খরচ কম হয়, তাছাড়া এর মাংস এবং ডিমের দাম বেশি দামে বিক্রি করা যায়। এজন্য বাড়িতেই লালন পালন করা খুবই সহজ। তবে অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে লালন পালন করতে চায় কিন্তু এর উৎপাদন কম হওয়ার কারণে অনেকে আগ্রহ হয় না। তবে আপনি যদি উন্নত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা নিতে পারেন সে ক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। এজন্য সরকারি প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর থেকে আপনি উন্নতমানের প্রশিক্ষণ নিতে পারেন, তাহলে সকল মুরগিগুলো থেকে অধিক পরিমাণে ডিম এবং মাংস পাবেন। এতে করে পারিবারিক পুষ্টি চাহিদা পূরণ হবে, পাশাপাশি আপনার কিছু আয়ও বেড়ে যাবে।
আপনি চাইলে দেশি মুরগি আবদ্ধ ভাবে অথবা অর্ধ আবদ্ধভাবে লালন পালন করতে পারেন। তবে ছেড়ে যদি লালন পালন করতে পারেন, সেই ক্ষেত্রে লাভ বেশি হবে। কেননা তারা মুক্তভাবে ঘোরাফেরা করবে এক্ষেত্রে তারা নিজের খাদ্য নিজেই সংগ্রহ করবে। তাছাড়া সূর্যের আলোতে তাদের ভিটামিন ক্যালসিয়াম শরীরে উৎপাদন হবে। এক্ষেত্রে তাদের ওষুধের প্রয়োজন হবে না, যার কারণে খরচ কম হয়। তবে আপনি যদি এটা বাণিজ্যিক হিসেবে নিতে চান সেক্ষেত্রে উন্নত জাতের দেশি মুরগি সংগ্রহ করতে হবে। এরপরে আপনি অল্প করে শুরু করতে পারেন তাহলে ভালো ফলাফল পাবেন।
সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা এবং যত্ন নিতে পারেন সে ক্ষেত্রে প্রত্যেকটা মুরগি অনেক ভালো থাকবে। এক্ষেত্রে আপনাকে তিন মাস পর পর বিক্রি করে দিতে হবে, তাহলে আপনি লাভবান হতে পারবেন। কেননা এরপরে অনেক বেশি খাবার খাবে কিন্তু ওজন বাড়বে না। এ ক্ষেত্রে আপনার ক্ষতি হবে, তাই তিন মাস পরেই আপনি বিক্রি করে দিবেন। কেননা অনেকেই লালন-পালন করার জন্য এই বয়সের মুরগিগুলো কিনে থাকে, তাছাড়া এই বয়সে মুরগিগুলোর অনেক কম দাম হয়ে থাকে। যার কারণে সবাই কিনতে পারে, তাছাড়াও এই বয়সে মুরগিগুলো অত্যন্ত সুস্বাদু এবং অনেক মজাদার।
দেশি মুরগি লালন পালন করার ক্ষেত্রে যেমন এর ওজন কম হয়, আকারে ছোট যার কারণে তারা খাবার খায় যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল, ডিম অত্যন্ত কম দিয়ে থাকে। যার কারণে তারা যে খাদ্য খায় এর তুলনায় ডিম কম হয়। তাছাড়া এই ডিমগুলো আকারে ছোট হয়, তবে ডিমের দাম বেশি রয়েছে। আপনি যদি বাণিজ্যিক হিসেবে করতে চান সে ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হতে পারেন। যদি আপনি ছাত্র অথবা চাকরি করেন পাশাপাশি পার্টটাইম হিসেবে এটা করতে পারেন। এতে আপনার মোটামুটি কিছু আয় আসবে, কেননা এই মুরগিগুলো লালন পালন করা সহজ রোগ বালাই কম হয়ে থাকে, তেমন একটা ঝুঁকি থাকে না। তবে আপনাকে কিছু বিষয়ে রোগবালায় এর সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে।
দেশি মুরগি সাধারণত বাড়ির যে খাবারগুলো খাওয়ার পরে আপনার বেঁচে যাবে, সেই সকল বাড়তি খাবার বা বাসি খাবার এরা খেয়ে বেঁচে থাকে। এতে করে অতিরিক্ত খাবার দেওয়া লাগলো না। আপনার খাবারের টাকা বেঁচে যাবে, প্রতিদিনই দেখা যায় ভাত তরকারি এগুলো যখন রেখে দেন সেগুলো মুরগিকে দিলে খেতে পারবে। তাছাড়াও গম ধান পোকামাকড় শাকসবজি, গাছ লতাপাতা ইত্যাদি খেয়ে তারা বেঁচে থাকে। এতে করে আপনার অতিরিক্ত খাবার কিনতে হয় না। যার কারণে খরচ অনেক কম হয়ে থাকে। তাছাড়াও এই খাবারগুলো খাওয়ার কারণে তাদের পুষ্টির চাহিদা পূরণ হয়, এতে করে অনেক সুস্থ থাকে।
আপনি যদি খাঁচায় অথবা আবদ্ধ ভাবে ভাবে লালন পালন করতে চান, সেই ক্ষেত্রে আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। খাঁচায় সাধারণত দেশি মুরগি যদি লালন পালন করতে পারেন সেই ক্ষেত্রে রোগব্যাধিক কম হবে, মারা যাবে কম। এছাড়াও খাদ্য ব্যবস্থাপনা চিকিৎসা সবকিছুই সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারবেন। এক্ষেত্রে যখন বাইরে ছেড়ে পালন করবেন সেই ক্ষেত্রে রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কেননা তারা বিভিন্ন মুরগির সাথে মিলিত হওয়ার কারণে রোগব্যাধি ছড়াতে থাকে। তবে যদি আপনি আবদ্ধ ভাবে পালতে পারেন সেই ক্ষেত্রে কিন্তু রোগব্যাধিক কম হবে। অবশ্যই আপনাকে সব সময় খাবার ও পানির ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হবে। তাছাড়া অতিরিক্ত গরম এবং ঠান্ডা নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।
তবে আপনি যদি আবদ্ধভাবে লালন পালন করেন, সেক্ষেত্রে আপনাকে উন্নতমানের খাদ্য খাওয়াতে হবে। এতে আপনার মুরগির দাম বেশি আসবে, ওজন বেশি আসবে। যার কারণে দাম বেশি হবে, তবে প্রাথমিক পর্যায়ে আপনি যখন বাচ্চা ফুটাবেন এরপরে মুরগির পরিচর্যা করতে হবে ভালোভাবে। যদি আপনি বাচ্চা ফুটান সে ক্ষেত্রে ৭ থেকে ১০ দিন এবং শীতকালে ১৫ থেকে ২০ দিনের মতো অথবা ভালোভাবে ব্রুডিং করা লাগবে। এতে করে আপনার সুন্দর মতে তাপমাত্রা পাবে, তাহলে দেখবেন বাচ্চা গুলো অত্যন্ত সুস্থ থাকবে। তবে এক্ষেত্রে আপনার উন্নতমানের খাবার দিতে হবে। প্রায় ১ মাস দানাদার খাদ্য পাওয়া যায় সেগুলো বাজার থেকে ভালো কোম্পানির ফিড খাওয়াতে পারেন তাহলে আপনি উপকৃত হবেন।
তবে যারা কম করে লালন পালন করবেন সে ক্ষেত্রে মুরগি যখন কুচে বসবে তখন তাকে ১৫ থেকে ১৮ টা ডিম দিয়ে বাচ্চা ফুটানোর জন্য চেষ্টা করবেন। এরপরে ২১ দিন পরে বাচ্চা ফুটে বের হবে, এরপর আপনাকে বাচ্চার প্রতি যত্নশীল হতে হবে। যেন কোন মতই তাদের ঠান্ডা না লাগে। এছাড়াও ঠান্ডা ডোজ করতে হবে, তাহলে আপনার মুরগির বাচ্চা বাঁচা সম্ভব হবে, তবে আপনি যদি বাণিজ্যিক হিসেবে করতে চান সে ক্ষেত্রে ইনকিউবেটর মেশিন কিনতে হবে।
তবে মুরগির বাচ্চাকে রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অবশ্যই রোগ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এবং ভ্যাকসিন দিতে হবে। ভ্যাকসিন ছাড়া মুরগি লালন পালন করা খুবই কঠিন বিষয়। ভ্যাকসিন দিলে অবশ্যই নিরাপদ থাকতে পারবেন। সেই ক্ষেত্রে আপনি অবহেলা করবেন না। এই ভ্যাকসিনের দাম খুবই কম। সরকারিভাবে যদি আপনি নিয়ে আসেন সে ক্ষেত্রে প্রচেষ্টা করে নিতে পারেন, এতে ২৫ টাকা করে নিতে পারে। তাই আপনারাও এই তথ্যটি জানা প্রয়োজন। কেননা আপনি যদি এন্টিবায়োটিক প্রয়োগ করেন, সেক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস হবে কিন্তু ভাইরাস মারা যাবে না। এটার উপযুক্ত সময় অবশ্যই টিকা দিতে হবে।
বাচ্চা ফুটানোর পর প্রথম দিনে সাধারণত চিনি পানি অথবা স্যালাইন দিতে পারেন। এতে করে বাচ্চার ক্ষুধা কম লাগবে, কেননা চিনির মধ্যে প্রচুর পরিমাণে শর্করা থাকে। এজন্য নিয়ম করে আপনাকে অবশ্যই ১ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত অবশ্যই যত্নশীল হতে হবে। এরপরে ৭ দিনের মধ্যে প্রথম ভ্যাকসিন দিতে হবে। সেটা মূলত রানীক্ষেতের টিকা, রানীক্ষেতের টিকা দেওয়ার পরে দ্বিতীয় ডোজ দিতে হবে। এরপরে আপনাকে অবশ্যই ২১ দিনে আবার রানীক্ষেতের ভ্যাকসিন দিতে হবে। তাছাড়াও এর মাঝে গাম্বুরা রোগের জন্য ১০ থেকে ১২ দিন বয়সে প্রথম টিকা, এছাড়াও ১৮ থেকে ২০ তারিখের মধ্যে দ্বিতীয় টিকা দিতে পারেন। এরপরে ৩৫ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে বসন্ত রোগের টিকা দিতে হবে।
যদিও দেশি মুরগি সাধারণত রোগ ব্যাধি কম হয় কিন্তু তারপরেও যদি আপনি বেশি লালন-পালন করেন। সেই ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসা দিতে হবে, এজন্য আপনাকে নিয়মিতভাবে ভ্যাকসিনেশন করতে হবে। উন্নত মানের খাবার দিতে হবে, এরপরেও যদি কোন মুরগি অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসা পরামর্শ নেওয়া লাগবে। এক্ষেত্রে অনেক ধরনের রোগ প্রতিরোধে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার পরামর্শ নিবেন। আপনি যদি সঠিক পন্থায় ভ্যাকসিন করতে পারেন, তাহলে মুরগি সুস্থ থাকবে। আর যদি সঠিকভাবে না করতে পারেন, তাহলে মুরগি মারা যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। উপরোক্ত নিয়মগুলো যদি সঠিক ভাবে প্রয়োগ করতে পারেন, তাহলে আপনি লাভবান হবেন।
আজকের এই পোস্টটি লিখেছেন, মাহমুদুল ইসলাম, দীর্ঘদিন যাবত এই দেশি মুরগি লালন পালন করছি। এর অভিজ্ঞতার আলোকে আজকের এই পোস্টটা লিখেছেন।

এম আর মাহমুদ ওয়েবসাইটের নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url